মানুষকে কষ্ট না দেয়ার ইসলামী মূলনীতি বনাম ফুলে ফেঁপে ওঠা ‘ওয়াজ ইন্ডাস্ট্রি’

কয়েকদিন আগে প্রায় মাঝরাতে চট্টগ্রাম শহরের ফিরিঙ্গিবাজার দিয়ে যাচ্ছি। রাস্তার এক পাশে গোটা পঞ্চাশেক চেয়ার পাতা, শামিয়ানা ও মঞ্চ সমেত। অর্ধেক চেয়ারই খালি। হুজুর প্রবল বিক্রমে নেচে কুঁদে ওয়াজ করে চলছেন। প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত মাইক লাগানো হয়েছে।

কিছু দূর পর পর এ রকম ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন চট্টগ্রামে খুব পরিচিত দৃশ্য। তবে গত কয়েক বছরে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন অন্যান্য অঞ্চলেও বেড়েছে বলে মনে হয়। আমাদের গ্রামে আমার শৈশবে একবার মাত্র একটা ওয়াজ মাহফিল হয়েছিলো বলে মনে পড়ে। আর এখন বছরে কয়েকটা মাহফিল হয়।

চট্টগ্রামে থাকি বিধায় শীতকালটা খুব যন্ত্রণায় কাটে। এই রাত প্রায় একটায়ও ওয়াজের যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারছি না।

কেউ কেউ মনে করতে পারেন, বেশ তো! ওয়াজ হচ্ছে, এটা তো ভালো কাজ। মানুষ হেদায়াত পাচ্ছে। কিন্তু হেদায়াত তো ভাই তবারক বিতরণের মতো বিলানোর জিনিস না। এইসব হুজুররাও হেদায়াতের বন্টনকারী নন।

ইসলামের একটা মূলনীতি হলো মানুষকে কষ্ট না দেয়া। অথচ, ওয়াজ মাহফিলের নামে প্রায় ভোর রাত পর্যন্ত এরা অসুস্থ, বৃদ্ধ, শিশু, কর্মজীবী মানুষসহ সবাইকে যেভাবে যন্ত্রণা দিচ্ছেন, তাতে নিশ্চিতভাবেই ইসলামের এই মূলনীতির খেলাফ হচ্ছে।

এটা ঠিক, নাচগান, ব্যান্ড পার্টি, কনসার্টসহ মডার্ন নানা উপাদানের বিরুদ্ধে একটা নিরুপায় অস্ত্র হিসেবে বহুদূর বিস্তৃত উচ্চ শব্দের মাইক ব্যবহার করে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করার একটা যুক্তি কেউ কেউ দিবেন হয়তো। কিন্তু ইসলামের মতো কল্যাণকামী একটা আদর্শের দোহাই দিয়ে এই কাজ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

দিনকে দিন ‘ওয়াজ ইন্ডাস্ট্রি’ ফুলে ফেঁপে ওঠার পেছনে ‘ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া’ তথা নবীগণের উত্তরসূরী হওয়ার দাবিদার এই ‘আলেমগণের’ ‘দুনিয়াবী’ স্বার্থটাই যে মুখ্য, তা বুঝতে খুব বেগ পেতে হয় না। নবীদের নবুয়তের স্বপক্ষে কোরআনে আমরা একটা যুক্তি পাই। সেটা হলো, নবুয়তীতে নবীদের কোনো ব্যক্তিগত লাভালাভের ব্যাপার নাই। অথচ ব্যতিক্রম বাদে নবীদের এই তথাকথিত ‘উত্তরসূরীগণ’ রীতিমতো লিখিত আর্থিক চুক্তিপত্র সম্পাদন ছাড়া ‘হেদায়েত বিতরণ’ করতে আসেন না!

ইসলাম সর্বদা এইসব যাজকতন্ত্রের বিরোধী ছিলো। ইসলামের পূর্ববর্তী ইহুদী-খ্রিষ্টান আলেমদের এহেন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কোরআনে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে, আমরা জানি।

তার উপর এসব ওয়াজ মাহফিলে যেসব বিষয় আলোচনা করা হয়, সেগুলোর কোনো কোনোটি নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক, এমনকি কোনোটা যথেষ্ট আপত্তিকরও বটে। যেমন, নারীদের ব্যাপারে অত্যন্ত সংকীর্ণ ও আপত্তিকর দৃষ্টিভঙ্গি।

আল্লাহ বলেছেন, দাওয়াত দাও সুন্দর ভাষায়। আর ইনাদের কথাবার্তা কোনো সুস্থ্য, স্বাভাবিক, সুন্দর মনের মানুষের পক্ষে হজম করা খুব কষ্টকর হবে। গালাগালি, চিল্লাচিল্লিই যেন ওয়াজের মূল বিষয়।

ওয়াজের নামে ইসলামের মর্যাদা নষ্টকারী এইসব ওয়ায়েজিনদের কার্যকলাপের ব্যাপারে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। ধর্মীয় অবমাননার ভয়ে অনেকেই কিছু বলেন না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরাই ইসলামের ক্ষতি করছে।

লেখাটির ফেসবুক  লিংক

Leave a Reply