পর্দা প্রসঙ্গে কোরআনের দলীলসমূহের পর্যালোচনা

পর্দা সংক্রান্ত আয়াত রয়েছে কোরআনের সূরা আহযাব এবং সূরা নূরে। চলুন,আয়াতগুলোর অর্থ শুরুতে পড়ে নেই।

প্রথমে সূরা আহযাবের ৩০-৩৩ নং আয়াত দুটি দেখা যাক:

৩০) হে নবী-পত্নীরা! যে কাজ স্পষ্টত অশ্লীল, তোমাদের মধ্যে কেউ তা করলে, তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে এবং এটা আল্লাহর জন্য সহজ।

৩১) তোমাদের যে কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি অনুগত হবে ও সৎকাজ করবে তাকে আমি পুরস্কার দিব দু’বার এবং তার জন্য রেখেছি সম্মানজনক রিযিক।

৩২) হে নবীর পত্নীরা! তোমরা অন্য নারীদের মতো নও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তাহলে পরপুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। এবং তোমরা পরিষ্কার ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে।

৩৩) এবং তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে; প্রাচীন জাহেলী যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থাকবে; হে নবীর পরিবার! আল্লাহ শুধু চান তোমাদের হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র করতে।

এবার একই সূরার ৫৯-৬২ নং আয়াতসমূহ দেখুন:

৫৯) হে নবী! তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মু’মিন নারীদেরকে বলে দাও তারা যেন তাদের চাদরের প্রান্ত তাদের ওপর টেনে নেয়৷ এটি অধিকতর উপযোগী পদ্ধতি, যাতে তাদেরকে চিনে নেয়া যায় এবং কষ্ট না দেয়া হয়৷ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷

৬০) যদি মুনাফিকরা এবং যাদের মনে গলদ আছে তারা, আর যারা মদীনায় উত্তেজনাকর গুজব ছড়ায় তারা নিজেদের তৎপরতা থেকে বিরত না হয়, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবার জন্য তোমাকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দেবো; তারপর খুব কমই তারা এ নগরীতে তোমার সাথে থাকতে পারবে৷

৬১) তাদের ওপর লানত বর্ষিত হবে চারদিক থেকে, যেখানেই পাওয়া যাবে তাদেরকে পাকড়াও করা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।

৬২) এটিই আল্লাহর সুন্নাত, এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে পূর্ব থেকে এটিই চলে আসছে এবং তুমি আল্লাহর সুন্নাতে কোনো পরিবর্তন পাবে না৷

পর্দার আয়াত নাযিলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:

পর্দা সংক্রান্ত সূরা আহযাবের এই আয়াতগুলো প্রথম নাজিল হয় পঞ্চম বা ষষ্ঠ হিজরীতে। খন্দক বা আহযাবের যুদ্ধে জয়লাভের পর ইসলামের বিরোধীপক্ষ বুঝে গিয়েছিল সামরিকভাবে মুহাম্মদকে (সা) পরাজিত করা তাদের পক্ষে রীতিমত অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে তারা মুসলমানদের নেতার চরিত্রহননের মাধ্যমে তাদেরকে নৈতিকভাবে পরাজিত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে তারা রাসূলের (সা) পালক পুত্র জায়েদের (রা) সাবেক স্ত্রী যয়নাব বিনতে জাহাশের (রা) সাথে মহানবীর (সা) বিয়েকে কেন্দ্র করে রটনা তৈরি করে। তখনকার কোনো কোনো সাধারণ মুসলমান এসব রটনার কিছু কিছু বিশ্বাসও করে ফেলেছিলো। তখন আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে ওহী নাযিল করে মহানবীকে (সা) সুস্পষ্ট সমর্থন প্রদান করেন।

এ ঘটনায় সুবিধা করতে না পেরে মদীনায় বসবাসরত ইহুদী, মুশরিক ও মুনাফিকরা নতুন করে মহানবীর (সা) পরিবারের উপর কালিমা লেপন করার পরিকল্পনা করতে থাকে। এ প্রসঙ্গে জেনে রাখা দরকার, মহানবীর (সা) স্ত্রীদের জন্য তৈরি করা ছোট ছোট খুপরি ঘরগুলো মসজিদে নববীর সাথে লাগোয়া ছিল। দিনরাত মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষের অবাধ যাতায়াত ছিল সেখানে। ফলে এই উন্মুক্ত পরিবেশের সুযোগ নিয়ে মহানবীর (সা) স্ত্রীদের ব্যাপারে আরেকটা রটনা তৈরি করার প্রবল আশঙ্কা ছিল।

পরিস্থিতি আন্দাজ করে তখন ওমর (রা) মহানবীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে তাঁর স্ত্রীগণ যেন পর্দাব্যবস্থার আওতায় চলে যান। তবে মহানবী (সা) তখনো ওমরের (রা) পরামর্শ বাস্তবায়ন করেননি।

এই প্রেক্ষিতে সূরা আহযাবের ৩২ ও ৩৩ নং আয়াত দুটি তার পরিবারবর্গের জন্য বিশেষভাবে নাজিল হয়। এ আয়াত দুটি তার পরিবারবর্গের জন্য খাস। আয়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনা থেকেই এটি বোঝা যায়। তবে ৫৯ নং আয়াতটি সব মুমিন নারীর জন্যই প্রযোজ্য। আয়াতটিতেই তা বলা আছে। পরবর্তী ৬০-৬২ নং আয়াতগুলোতে দুষ্টচিন্তার লোকজন ও রটনাকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহ সুস্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়েছেন।

পর্দা সংক্রান্ত কোনো আলোচনা, নিবন্ধ বা বইপত্রে এই প্রেক্ষাপট নিয়ে কাউকে কথা বলতে দেখি না। বিশেষ করে, ৬০-৬২ নং আয়াতগুলো পর্দা সংক্রান্ত রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখি না। পর্দার আয়াত নাযিলের এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সবাই কেন এড়িয়ে যান, তা আমার বুঝে আসে না।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পর্দার সাধারণ বিধান:

এবার আসুন সূরা নূরের পর্দা সংক্রান্ত আয়াতগুলো পর্যালোচনা করি।

৩০) হে নবী! মু’মিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হেফাজত করে ৷ এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র পদ্ধতি ৷ যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন ৷

৩১) আর হে নবী! মু’মিন মহিলাদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানগুলোর হেফাজত করে আর তাদের সাজসজ্জা না দেখায়, যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তা ছাড়া ৷ আর তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল দিয়ে তাদের বুক ঢেকে রাখে৷ তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে নিম্নোক্তদের সামনে ছাড়া— স্বামী, বাপ, স্বামীর বাপ, নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজের মেলামেশার মেয়েদের, নিজের মালিকানাধীনদের, অধীনস্থ পুরুষদের যাদের অন্য কোনো রকম উদ্দেশ্য নেই এবং এমন শিশুদের সামনে ছাড়া যারা মেয়েদের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ ৷ তারা যেন নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেবার উদ্দেশ্য সজোরে পদক্ষেপ না করে৷ হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে৷

এখানে সকল মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য পর্দা সংক্রান্ত সাধারণ বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। এটি সূরা আহযাবের ধারাবাহিকতা। খেয়াল করলে দেখবেন, প্রথমেই পুরুষদেরকেও পর্দা পালন সংক্রান্ত কিছু নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আরেকটা বিষয় হলো, সাধারণ মুসলিম নারীদের মুখ ঢাকার কথা কোথাও বলা নেই। বিশেষত নারীদের জন্য পর্দার ক্ষেত্রে ৫টি বিষয় আয়াতগুলো থেকে পাওয়া যায়।

১) দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে।

২) লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে হবে।

৩) আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়া সাজসজ্জা ছাড়া বাড়তি সাজসজ্জা প্রদর্শন করা যাবে না।

৪) তবে সাজসজ্জা প্রদর্শন করতে পারবে গায়রে মাহরামদের সামনে।

৫) উড়না দিয়ে যেন বক্ষদেশ ঢেকে রাখে/ চাদরের প্রান্ত যেন নিজেদের উপর টেনে নেয়।

এই পাঁচটি পয়েন্টের মধ্যে ৩ এবং ৫ নং পয়েন্ট নিয়েই যত বিতর্ক। এগুলোর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলতে চান, এগুলো দ্বারা মুখ ঢাকাও উদ্দেশ্য। অথচ, হাদীসের অসংখ্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, মহিলা সাহাবীগণ মসজিদে গিয়েছেন, ক্ষেত-খামারে কাজ করতেন, এমনকি বাজারের দায়িত্ব পালনের কথাও আমরা জানি।
মোট কথা, কোরআনের আয়াত থেকে স্পষ্ট,সাধারণ মুমিন নারীদের জন্য মুখ ঢাকার বাধ্যবাধকতা নেই।

নবীপত্নীদের জন্য প্রযোজ্য বিধান কি অন্যদের জন্যও প্রযোজ্য?

কেউ কেউ বলেন, নবীপত্নীদের জন্য পর্দার যে বিধান, তা সাধারণ মুসলমানদের জন্যও প্রযোজ্য। এ কথার দুটি সমস্যা আছে।

প্রথমত, যদি তাই হতো, তাহলে বিধানটি আমভাবে সবার জন্য নাযিল করা হতো। নবী পরিবারের জন্য খাস এবং সাধারণ মুমিনদের জন্য আমভাবে ভিন্ন রকম বিধান নাযিল হতো না।

দ্বিতীয়ত, পর্দার বিধান ছাড়াও নবী ও নবী পরিবারের জন্য খাসভাবে কিছু বিধান আছে যেগুলো অন্যদের জন্য প্রযোজ্য নয়। যেমন: (১) রাসূলের (সা) জন্য চারটির৷ অধিক বিয়ে জায়েজ করা হলেও অন্য কারো জন্য তা জায়েজ নেই। (২) রাসূল (সা) ও তাঁর পরিবারবর্গের জন্য সদকা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হলেও অন্যদের জন্য তা জায়েজ। (৩) রাসূলের (সা) সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদের মাঝে বন্টন নিষিদ্ধ হলেও অন্য মুসলমানদের জন্য এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত বিধান রয়েছে।

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, রাসূলের (সা) পবিত্র স্ত্রীগণের জন্য বিশেষ পরিস্থিতিতে খাসভাবে পর্দার যে বিধান নাযিল হয়েছিলো, তা সাধারণ মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য নয়। সাধারণ মুসলমানদের জন্য বরং পর্দার সাধারণ বিধান, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন, তা-ই প্রযোজ্য।

শেষকথা:

পর্দা ইস্যুতে ব্যাপকভাবে ভুল বুঝাবুঝির একটা অন্যতম কারণ হলো প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে বিচ্ছিন্ন রেফারেন্সের ভিত্তিতে ইসলামকে বুঝতে যাওয়া। পর্দার বিধান যখন ধাপে ধাপে নাজিল হচ্ছিলো, তখনকার মদীনার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। তাহলে আমরা বুঝতে পারবো কেন রাসূলের (সা) স্ত্রীগণ এবং অপরাপর মুসলমানদের জন্য দুই ধরনের বিধান দেয়া হয়েছে। কিন্তু কনটেক্সটকে বাদ দিয়ে শুধু রেফারেন্স এবং পরবর্তী যুগে প্রদত্ত এসব রেফারেন্সের লোকপ্রিয় ব্যাখ্যাগুলোকে কোরআন-সুন্নাহর দলীলের সমমান হিসেবে বিবেচনা করলে আমরা ভুল উপসংহারে পৌঁছবো।

ফেসবুক লিংক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *