বিয়োগ ১৪ ফেব্রুয়ারি

যখন ছিলেন
২০০৮ সাল। কুরবানীর ঈদের আগে। আমি আর আব্বা রিকশায় করে গরুর হাটে যাচ্ছি। জীবনে হাতেগোনা যে কয়েকবার আব্বার সাথে অন্তরঙ্গ হয়েছি, সেই দুর্লভ মূহুর্তগুলোর মধ্যে সেদিন ছিল একদিন। সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছি, তখনো ভর্তি হইনি। রিকশা চলছে, আমরা নানা বিষয়ে কথা বলছি। আব্বা এক ফাঁকে বললেন, ‘তোমাকে ম্যাজিস্ট্রেট হতে হবে।’ এই একটা ব্যাপার, আমাদের সব ভাই-বোনকে তিনি তুই সম্বোধন করতেন, ব্যতিক্রম ছিলাম আমি। যতদূর মনে পড়ে, আমাকে ‘তুমি’ করেই বলতেন সবসময়। এর আগে কোনোদিন তিনি বলেননি, আমাকে নিয়ে তাঁর কোনো স্বপ্ন আছে। আমিও বুঝতে পারিনি।

আব্বা খুব রাশভারি মানুষ ছিলেন। আমাদের যে কোনো প্রয়োজন আম্মাকে জানাতাম। আব্বার সাথে আমাদের ফ্রেন্ডলি সম্পর্ক ছিলো না। তাই সহসা তাঁর স্নেহের পরশ টের পেতাম না। তবে হঠাৎ হঠাৎ পিতার অপত্য স্নেহের বন্ধনে আটকা পড়ে যেতাম। তখন বুঝতাম তাঁর ভালোবাসার মায়াজালের ভেতরেই আমাদের বসবাস। ছোট বেলায় আমার চোখের এক্সিডেন্টের পর আব্বার টেনশন, দৌড়-ঝাঁপ আবছা আবছা মনে পড়ে।

হারিয়ে যাওয়া…
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে আব্বা হারিয়ে গেলেন। রাতে সাড়ে আটটার সময়ও ছোট আপা আমাকে ফোন করে জানতে চাইছিলেন, আব্বাকে পেইন কিলার দিবেন কি না। তখনো বুঝিনি আর কোনো দিন তাঁকে পেইন কিলার দিয়ে বুকের ব্যাথা কমাতে হবে না।

সবাই ভেবেছিল আমি বুঝি খবরটা সহ্য করতে পারবো না। তাই আমাকে কেউ বলেনি যে, আব্বা আর নেই। কিন্তু স্নেহের বন্ধন যখন টুঁটে যায়, তখন কি আর তা বলে দিতে হয়!! বোবা কান্না চেপে ৯ ঘণ্টার নির্ঘুম পথ পাড়ি দিয়ে পরদিন সকালে যখন বাড়ি পৌঁছি, সেই কান্না তখন সকল প্রতিরোধের উর্ধ্বে সরব হয়ে উঠেছিল।
আব্বা আমাকে আগেই দেখিয়ে দিয়েছিলেন কোথায় তাঁকে কবর দিতে হবে। আব্বাকে দাফন করার মাধ্যমে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানের উদ্বোধন হয়েছিল সেদিন।

তারপর
আমার কল্পনার দৌড় বোধহয় একটু বেশিই। আব্বা চলে যাওয়ার আগেই আমি মাঝে মধ্যে ভাবতাম, আব্বাকে হারিয়ে আমাদের ৭ ভাই-বোনের সংসারটা দাঁড়িয়ে আছে, শোকে মূহ্যমান। হালভাঙা নাবিকের মতো, স্রোত যেদিকে নিয়ে যায়, তেমন।

বাস্তবেও এর খুব একটা হের-ফের হয়নি। আমরা চলছি আমাদের মতো করে। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সবার খোঁজ-খবর নেয়াও বন্ধ হয়ে গেলো। খুব কাছের বন্ধুদের মূঢ়তা দেখে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তবে কষ্ট পুষেই বা আর লাভ কি! জীবনের পরিণতি তো মৃত্যুতে গিয়েই ঠেকে! পরজীবনে আল্লাহ তায়ালা আব্বাকে ভালো রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *