নারী দিবস উপলক্ষ্যে দুটি বই সম্পর্কে চারটি কথা

মাওলানা আব্দুর রহীমের ‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন’ বইটা বিভিন্ন সময় অনেকের বাসায় দেখেছি। আব্বার কাঠের আলমারিতেও দেখেছি ছোটবেলায়। সমরেশের ‘কালপুরুষ’ আর এই বইটা একই তাকে ছিলো পড়ার আগ্রহ থেকে কদিন আগে বইটা কিনলাম। প্রতিদিন কিছু কিছু পড়ে আজ সকালে শেষ করেছি। ফাস্ট রিডিং দিয়েছি বলা যায়।

বইটা পড়ে প্রচণ্ড হতাশ হয়েছি। নারীদের মসজিদে যাওয়ার অধিকারকে লেখক অস্বীকার করেছেন। ঘরের ভেতরে জীবন কাটিয়ে দেয়াকেই নানাভাবে জাস্টিফাই করেছেন। এমনকি বিয়ের সময় পাত্রীপক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদেয় উপহারকে এমনভাবে গ্লোরিফাই করেছেন, কেউ হয়তো একে যৌতুকের পক্ষে দলীল হিসেবে বিবেচনা করবে!

বইটি পড়লে মনে হবে,নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে মূলত পুরুষের যৌন চাহিদা মিটানো এবং সাংসারিক ঝামেলা সামলানোর জন্য। পরিবার ও সমাজে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের ব্যাপারটি যেন শুধু পুরুষদেরই কাজ। মজার ব্যাপার হলো, এসব চরম রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিগুলো জাস্টিফাই করার জন্য তিনি কোরআন-হাদীসের অস্পষ্ট রেফারেন্সের আশ্রয় নিয়েছেন, যেখানে তিনি নিজেই যেসব সুস্পষ্ট রেফারেন্স শুরুতে উল্লেখ করেছেন সেগুলো এর বিরোধী। এমনকি কোরআন হাদীসের বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তির উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে সেসবকে রেফারেন্স হিসেবে দেখিয়েছেন। চরম বায়াসড না হলে এটা কী করে সম্ভব?!

বইটি পড়ার শুরুতে আমার অনুমান ছিলো- নারী-পুরুষ মিলেই যেহেতু পরিবার সেহেতু পরিবার ব্যবস্থাপনায় উভয়ের দায়-দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে আলোচনা থাকবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বইটিতে মূলত নারীদের কর্তব্য ও দায়দায়িত্বের উপরই জোর দেয়া হয়েছে। এ জন্য আসলে বইটির নাম হওয়া উচিত ‘একজন আল্ট্রা কনজারভেটিভ মুসলিম পুরুষের দৃষ্টিতে নারীর পরিবার ও পারিবারিক জীবন’।

আবদুল হালীম আবু শুককাহর ‘রসূলের স. যুগে নারী স্বাধীনতা’ (বাংলা অনুবাদ মোট ৪ খণ্ড) বইটি পড়া শুরু করেছি আজ থেকে। বেশ ভালো লাগছে। অনুবাদ খুব একটা সুবিধার নয়, আবার একেবারে খারাপও নয়। বিষয়বস্তু সম্পর্কে এখনই হয়তো চূড়ান্ত মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে যতটুকু পড়েছি, এক কথায়, দারুণ।

মুসলিম সমাজে নারীরা যে পিছিয়ে পড়েছে এবং এক্ষেত্রে ইসলামের অপব্যাখ্যাই যে অনেকটা দায়ী, কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই তা স্বীকার করা হয়েছে। কোরআন-হাদীসের ভুল রেফারেন্স ও অপব্যাখ্যা দিয়ে কীভাবে এই অপকর্মগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে করা হয়েছে, সেগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। আত্মমর্যাদা ও মানবিক মর্যাদাসহ নারীকে ইসলাম কীভাবে দেখে, সে বিষয়ে এটি প্রামাণ্য একটি বই বলেই মনে হচ্ছে।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *