পড়াপড়ি, গ্রন্থপূজা ও লেখকের মূল্যায়ন

শিরোনাম যা দিয়েছি, মাশাল্লাহ, একটা বই লিখে ফেলা যাবে এই শিরোনামে যা হোক, সংক্ষেপে বলি।

১.
কয়েকদিন আগে একটি ফেসবুক গ্রুপে একজন পোস্ট করেছেন, তার পরিচিত এক ছোট ভাই বই পড়ায় আগ্রহী নয়। তাকে আগ্রহী করে তুলতে হলে কী ধরনের বই দেয়া যায়, তিনি তা জানতে চেয়েছেন। তো বিনা পয়সায় উপদেশ দেয়ার সুযোগ পাইলে বাঙ্গালি জাতি আবার অত্যাধিক উত্তেজিত হয়ে যায়। এটা ঐতিহাসিক সত্য। কোরআনের তাফসীর, হাদীসের বই, ধর্মীয় কিতাব, মোটিভেশনাল বুকসহ হেন কোনো বইয়ের ক্যাটাগরি নাই, যা বাঙ্গাল জাতি ওই পোস্টে সাজেস্ট করে নাই।

মাঝেমধ্যে ভাবি, আমরা এতো কিউট কেন? যে ছেলে বই পড়তেই আগ্রহী না, তাকে যদি নন-ফিকশন, তাও আবার ধর্মীয় পুস্তকাদি ধরিয়ে দেয়া হয়, সে তো ব্লুহোয়েলের পঞ্চাশতম ধাপে চলে যাবে প্রথম দিনেই।

আমি মনে করি, ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার অভ্যাস থাকা উচিত। যে কোনো ধরনের বই। অনেকে আশংকায় থাকে, ছোটরা অমুকের বই পড়লে মিস গাইডেড হয়ে যাবে। তমুকের বই পড়লে মাথা খারাপ হয়ে যাবে।

মতাদর্শ যদি আপনার সত্যিই কনসার্ন পয়েন্ট হয়, তাহলে ছোটদেরকে বই পড়ার বিধিনিষেধ আরোপ না করে মতাদর্শের কনসেপ্টটা তার কাছে ক্লিয়ার করুন। এই দীর্ঘমেয়াদী ও তুলনামূলক কষ্টকর কাজে না গিয়ে বই পড়ার বিধিনিষেধ আরোপের শর্টকার্ট রাস্তায় হাঁটলে দিন শেষে আপনারই ক্ষতি।

২.
সলিমুল্লাহ খান বোধহয় বাংলাদেশে বুকিশনেসের সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ। ‘প্রতিমাসে ১০টি বই পড়ুন’ জাতীয় ক্যাম্পেইনও ফেসবুকে দেখি মাঝেমধ্যে। এসব বরাবরই আমার না-পছন্দ। যেন শয়ে শয়ে বই পড়লেই দুনিয়ার তাবৎ জ্ঞানের সাগরে আপনি হাবুডুবু খেতে থাকবেন। কাউকে কাউকে দেখি বাতিঘরে গিয়ে চেকইন দিয়ে বা বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলে ফেসবুকে আহাজারি করে, এই অসীম জ্ঞানভাণ্ডারের তুলনায় তার জীবনটা কত ক্ষুদ্র!

বই পড়াটা অবশ্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে চিন্তাভাবনা করা আরো গুরুত্বপূর্ণ। তার চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ অনুভব করা। গ্রন্থপূজা ও লেখকপূজা আপনাকে চিন্তাভাবনার লাইনে যেতে দেবে না, অনুভব করা তো আরো দূরের ব্যাপার।

৩.
আরেকটা ব্যাপার বলে শেষ করি। পছন্দের বা অপছন্দের লেখকের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনেকেই তার লেখকসত্তা ও ব্যক্তিজীবনকে গুলিয়ে ফেলেন। আমি মনে করি, এটা ঠিক নয়। একজন লেখকের মূল্যায়ন তার লেখার কন্টেন্ট অনুযায়ীই হওয়া উচিত। ব্যক্তিজীবনে তিনি কেমন, সেই মূল্যায়ন তার ব্যক্তিজীবনের সাথে যারা সম্পর্কিত, তাদের উপরই ছেড়ে দেয়া উচিত।

ফেসবুক লিংক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *