আমাদের সংকীর্ণ স্বার্থবাদিতা

বেশ কয়েক মাস পর গ্রামে এলাম। আমাদের গ্রামটা একেবারে ছবির মতো। গ্রামের প্রায় তিন দিক দিয়ে বয়ে গেছে চিনাদী বিল। বিলের সাথে লাগোয়া সারি সারি ফসলী জমি। তারপর ঘরবাড়ি। বেশ বড় গ্রাম।

ভর দুপুরে বিলের ধারে গেলেও শীতের তীব্রতায় রোদের আঁচ গায়ে লাগেনি। এক পাড়াতো ভাই আমাদের আলু ক্ষেতটা করছেন এখনো। আম্মা তেভাগা দিয়ে দিয়েছেন। আমাদের শৈশবে অবশ্য আমরা নিজেরাই করতাম।

তখন আলু তোলার সময় হলে বেশ উৎসাহ তৈরি হতো। আমরা ভাই-বোনেরা সারি বেধে আলু তুলতাম। নানান গল্পগুজব হাসিঠাট্টা চলতো। মুরুব্বী গোছের কেউ এসে আলাপ জুড়ে দিতেন। তিন কালের গল্প। আলু তোলা নিয়ে মজার মজার গল্প শুনতাম। তবে দুদিন বাদেই অবশ্য আমাদের উৎসাহে ভাটা পড়তো।

আলু ক্ষেতের এক পাশে অল্প করে পেয়াজ, রসুন, ধনিয়া করা হতো। ক্ষেতটার বাকি অংশে ধানের বীজ বোনা হতো। আমরা বলি, জালাপাট। ধানের ছোট ছোট চারাকে বলা হয় জালা।

জালা তোলাটা আলু তোলার মতো আরামদায়ক ছিলো না। আলু তোলার মধ্যে এক ধরনের এডভাঞ্চার ছিলো। গুপ্তধন খুঁড়ে বের করার মতো অনেকটা। কিন্তু জালা টেনে তুলে গোড়ায় লেগে থাকা মাটি পরিস্কার করাটা বেশ কষ্টসাধ্য ছিলো। আমরা ছোট একটা লাঠি নিয়ে যেতাম। সেটাতে বারি দিয়ে মাটি ছাড়াতাম। কিন্তু বড়রা হাতে বা পায়ে বারি দিয়ে মাটি ছাড়াতো। তো নিজেদেরকে বড় প্রমাণের এই মোক্ষম সুযোগটা সাধারণত হাতছাড়া করতাম না। তবে বিনিময়টা অতিরিক্ত হয়ে যেতো আরকি। আমাদের কচি হাত ছুলে যেতো। কিন্তু প্রেস্টিজ কনসার্নের কারণে কাউকে বুঝতে দিতাম না। হা হা।

আরো কতসব স্মৃতি…! মাছ ধরা, ধান কাটা, সরিষা তোলা, নাড়ার আগুনে শীত পোহাতে পোহাতে আলু পুড়ে খাওয়া….। জালাপাটে দাঁড়িয়ে শৈশব-কৈশোরের সেইসব স্মৃতি এক লহমায় এসে ভীড় করলো যেন।

তবে একতরফাভাবে গ্রামের এসব স্মৃতিকথনের একটা সমস্যা আছে। এই চমৎকার সবুজ প্রকৃতি, মাঠঘাট, বিলঝিল, আমকাঁঠালের বাগানের ভেতরে থেকে মানুষগুলোর হওয়ার কথা ছিলো প্রকৃতির মতো উদার ও সরল। আনফরচুনেটলি, কেন যেন তারা অনেক ক্ষেত্রে তার উল্টোটা। গতকাল বিকেলেই একজনের সাথে হওয়া আলাপের বিষয়বস্তুটা বললে কিছুটা বুঝতে পারবেন। ভদ্রমহিলা কারো সাতেপাঁচে নেই। একেবারেই সাধারণ, সহজ-সরল। কিন্তু তিনি আমাকে যা বললেন তার সারকথা হলো-

বাবা, দুনিয়াডা হইলো কেডা কারে ল্যাং মাইরা খাইতে পারে সেই জায়গা। কারে মাইরা কে উপ্রে উঠবো, কারে ডাবায়া দিবো – এইগুলা কইরাই এখানে চলোন লাগে। এই তো আছি আর কয়ডা দিন। আগের তারা তো সহি সালামতে গেছে গা। এখন আমরা যাইতে পারলেই হইলো।

খেয়াল করে দেখেন- সহজ-সরল, কারো সাতেপাঁচে না থাকা একজন গ্রামীণ মানুষের চিন্তার মধ্যে কী পরিমাণ তীব্র আত্মস্বার্থবাদী চিন্তা বাসা বেঁধে আছে। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে যদি সংকীর্ণ আত্মস্বার্থবাদিতা ডমিন্যান্ট না হতো, তাহলে এটা সম্ভব হতো না বোধহয়। আমি নিছক অনুমান থেকে বলছি না, পর্যবেক্ষণ থেকেই কথাটি বলছি।

আমার খুব কষ্ট লাগে। এতো চমৎকার প্রকৃতিও মানুষকে স্বার্থবাদী চিন্তার বাইরে আনতে পারলো না!

লেখাটির ফেসবুক লিংক

Leave a Reply