নারীবাদ প্রসঙ্গে কিছু কথা

নারীবাদ ইস্যুটি সোশ্যাল মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। গত কয়েক বছরে অনেকবারই এটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লোকজনকে সরব হতে দেখেছি। এ প্রসঙ্গে আমার কিছু ভাবনা আছে। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে নারীবাদ ধারণাটি নিয়ে সংক্ষেপে একটু বলে নিতে চাই।

নারীবাদ ধারণাটি কীভাবে এলো?

১৮ শতকের আগে নারীবাদ ধারণাটির কথা জানা যায় না। মূলত পাশ্চাত্যে ধারণাটির উৎপত্তি। পাশ্চাত্য সমাজে নারীদেরকে মনো করা হতো অশুভ, ডাইনী ইত্যাদি। ডাইনী অভিযোগে নারীদের পুড়িয়ে মারার সামাজিক প্রথাও ছিল। এসব কুসংস্কার তো ছিলই, এর পাশাপাশি আইনগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলো থেকেও তারা বঞ্চিত ছিল। নারীদের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের এহেন দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে খ্রিষ্টধর্মের ফ্রেমওয়ার্ক বোধহয় অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে। যাক সে কথা।

নারীবাদ আন্দোলনকে পাশ্চাত্য একাডেমিয়ায় মোটাদাগে তিনভাগে ভাগ করা হয়–

(১) প্রথম পর্যায় (First Wave): নারীবাদের প্রথম পর্যায়ের সময়কাল ধরা হয় ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত। নারীবাদী আন্দোলনের এই পর্যায়টি মূলত পাশ্চাত্যে নারীদের আইনগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের কাল। এর আগে পাশ্চাত্যে সম্পত্তির উপর নারীদের মালিকানার অধিকার ছিল না। বিবাহ বন্ধন বা বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীদের মতামতের গুরুত্ব ছিল না।

ঊনিশ শতকে এই অধিকারগুলো আদায়ের জন্য পাশ্চাত্যের নারীরা আন্দোলন শুরু করে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তা রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পরিণত হয়। ফলশ্রুতিতে ১৯১৮ সালে যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো নারীরা সীমিত আকারে ভোটাধিকার লাভ করে।

(২) দ্বিতীয় পর্যায় (Second Wave): নারীবাদ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়টি শুরু হয় মূলত যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে। এই পর্যায়ে নারীবাদী আন্দোলন নতুন রূপ লাভ করে। নারীবাদী আন্দোলনের প্রথম পর্যায় যেখানে বিভিন্ন অধিকার আদায়ের ইস্যুতে সোচ্চার ছিল, দ্বিতীয় পর্যায়ের নারীবাদীরা সেখানে নানা ধরনের আইনী ও সামাজিক ‘বৈষম্য’ নিয়ে কথা বলা শুরু করে। ডমেস্টিক ভায়োলেন্স, ম্যারিটাল রেপ ইস্যু, সেক্সের স্বাধীনতা, সন্তান উৎপাদনের স্বাধীনতা, ডিভোর্স আইনসহ বিদ্যমান নানা বৈষম্যের প্রতিবাদে তারা আন্দোলন শুরু করে।

দ্বিতীয় পর্যায়ের নারীবাদী আন্দোলনের ব্যাপারে সমালোচনা আছে যে, তারা নারীবাদী আন্দোলনের মূল ধারা থেকে চ্যুত হয়ে সেক্সুয়ালিটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

(৩) তৃতীয় পর্যায় (Third Wave): ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে নারীবাদী আন্দোলনের তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়। এই পর্যায়ের নারীবাদীরা দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলনের সমালোচনা করে। তাদের মতে, নারীবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় মূলত শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত নারীদের আকাঙ্খার দিকেই মনোযোগী ছিল। তাদের মতে, তৃতীয় বিশ্বের নারীদের চ্যালেঞ্জ পাশ্চাত্যের নারীদের চ্যালেঞ্জ থেকে ভিন্ন।

যাইহোক, নারীবাদী আন্দোলনের আরো রকমফের আছে। সেদিকে আর না যাই। এবার প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া যাক।

হিজাবী ফেমিনিস্ট

সোশ্যাল মিডিয়ার সূত্রে গত ক’বছরে ‘হিজাবী ফেমিনিস্ট’ (কেউ কেউ ইসলামিক ফেমিনিস্টও বলে থাকেন) বলে একদল নারীবাদীর লেখালেখি পড়ার সুযোগ হয়েছে। তারা ইসলামের ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে থেকেই নিজেদেরকে নারীবাদী বলে দাবি করেন। এরা মূলত সমাজের তুলনামুলক সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী– মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চ মধ্যবিত্ত, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন, দেশে বা দেশের বাইরে ভালো পজিশনে আছেন। যৌথ পরিবারের বিরোধিতা, বউ-শাশুড়ি দ্বন্দ্ব, ক্যারিয়ারসহ নানা মনোজাগতিক ইস্যু নিয়ে তারা সরব।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশের সমাজের মূল স্রোতের নারীরা অর্থাৎ নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কিংবা অতি দরিদ্র নারীরা যেসব সমস্যা মোকাবেলা করছে, সেসব নিয়ে তাদেরকে সাধারণত সরব হতে দেখা যায় না। তাদের স্ব স্ব সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থানের স্বার্থের আলোকে তারা এক্টিভিজম করেন। এই প্রবণতাকে পাশ্চাত্য নারীবাদ ধারণার এক ধরনের ইসলামী মোড়ক বলা যায়। যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদ, ভোগবাদ ও স্বার্থপরতা।

ইসলাম ও নারীবাদ, কিংবা মোহাম্মদ (সা) কি নারীবাদী ছিলেন?

গত অক্টোবরে আমেরিকান পত্রিকা হাফিংটন পোস্টের ব্লগে Muhammad Was A Feminist শিরোনামে একটি পোস্ট পাবলিশ হয়। ইতোমধ্যে লেখাটির বাংলা অনুবাদও হয়েছে। এই সূত্র ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কিছু সমালোচনা চোখে পড়লো।

যাইহোক, একটা প্রশ্ন করি। মহানবীর (সা) পক্ষে আদৌ কি নারীবাদী হওয়া সম্ভব ছিল? নারীবাদ ধারণাটি বিকাশ লাভের অন্তত সহস্রাধিক বছর আগেই তো তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। তারপরও পাশ্চাত্যের একজন লেখক তাঁকে নারীবাদী বলছেন কেন? নারীবাদ সম্পর্কে আমাদের যতো সমালোচনাই থাকুক না কেন, এই প্রশ্নটির দিকে আমাদের মনোযোগী হওয়া দরকার। যে পেক্ষাপটে পাশ্চাত্যে নারীবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, সেগুলো একটু স্মরণ করুন! সম্পত্তির উপর নারীদের মালিকানার অধিকার, বিবাহ বন্ধন ও বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীদের মতামতের অধিকারসহ নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্যের ফলেই পাশ্চাত্যে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।

অথচ, পাশ্চাত্য সভ্যতা বিকাশ লাভের সহস্রাধিক বছর আগে এই অধিকারগুলো ইসলাম নিছক নীতিকথা হিসেবেই বলেনি, বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করেও দেখিয়েছে। মহানবী (সা) নিজের জীবনে এগুলো মেইনটেইন করে দেখিয়েছেন। তাঁর সাহাবীগণ দেখিয়েছেন। এভাবে ইসলামী সভ্যতার পতনের আগ পর্যন্ত মুসলিম সমাজে এগুলো কমবেশি ছিল।

[আরো পড়ুন: মুসলিম নারী স্কলারদের বিস্মৃত ইতিহাস]

পাশ্চাত্য সমাজের অভিজ্ঞতায় বেড়ে ওঠা একজন ব্যক্তি যখন দেখেন যে, বহু শত বছর আগেই আরবের মরুভূমিতে একজন নবী এগুলো বাস্তবায়ন করে গেছেন, তখন সেই ব্যক্তির পক্ষে তাঁকে নারীবাদী সাব্যস্ত করাটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়।

কিন্তু আমাদের কাছে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হওয়া উচিত নয়। বরং নারীদেরকে মানবিক মর্যাদায় আসীন করতে মহানবী (সা) যেসব কাজ করে গেছেন (যার কিছু কিছু ওই ব্লগ পোস্টেও এসেছে) সেগুলোর উপর জোর দেয়াই হলো আসল কাজ।

উত্তরাধিকার আইন বাস্তবায়নে সামাজিক আন্দোলন

এটা তো ঠিক যে, বাংলাদেশের সমাজের মূল স্রোতে নারীরা অবহেলিত, কোনঠাসা, অধিকার বঞ্চিত ও ক্ষেত্রবিশেষে নির্যাতিত। আমাদের সমাজে ইসলাম মেনে চলার দাবিদারদের কয়জন এমন রয়েছেন, যারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান অনুযায়ী নারীদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেন? সংখ্যাটা যে নিঃসন্দেহে খুবই নগণ্য, তা বুঝার জন্য বড় কুতুব হওয়ার প্রয়োজন নেই।

নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিয়ে সোচ্চার এনজিওবাদী এক্টিভিস্টদের সমালোচনা তো অনেকেই করে। কিন্তু পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে এদের অনেকেই তো নিজের কন্যা, বোন, ফুফু বা খালাকে বঞ্চিত করে। অথচ উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান যেন সমাজে বাস্তবায়িত হয়, এই লক্ষ্যে যদি একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যেত, তাহলে কী অভূতপূর্ব একটা ব্যাপারই না ঘটতো! দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নিঃসন্দেহে এ থেকে উপকৃত হতো। এর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রভাব হতো সুদূরপ্রসারী। আর রাষ্ট্রীয় আইনও অন্তত এ ক্ষেত্রে অনুকূলেই রয়েছে।

মহানবীকে (সা) নারীবাদী বলায় কেউ কেউ যেভাবে শকড হয়েছেন, উত্তরাধিকার বণ্টনে সমাজে ইসলামের বিধানের প্রয়োগ না থাকায় এই পরিমাণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কখনো চোখে পড়েনি।

আমাদের মনে রাখা দরকার, ইসলাম হলো এমন এক ব্যবস্থা, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে যার ছাপ থাকবে। খ্রিষ্টধর্মের মতো ইসলাম কিছু নীতিকথা ও ইবাদত সর্বস্ব নিষ্প্রাণ ধর্ম নয়। সূরা বাকারার ১৭৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,

পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ ফেরানোর মধ্যে কোনো সৎকর্মশীলতা নেই। বরং সত্যিকারের সৎকর্মশীলতা হলো– যারা আল্লাহ তায়ালা, কেয়ামত দিবস, ফেরেশতা, আসমানী কিতাব ও সমস্ত নবী-রাসূলদের উপর ঈমান আনে; আল্লাহকে ভালোবেসে আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি, সাহায্যপ্রার্থী মুসাফির ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসের জন্য সম্পদ ব্যয় করে; নামাজ প্রতিষ্ঠা ও জাকাত আদায় করে; কোনো ওয়াদা করলে তা রক্ষা করে; দারিদ্র্য, দুঃখকষ্ট ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণ করে। এই ব্যক্তিরাই হলো সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই হলো সৎকর্মশীল।

আপনার মন্তব্য লিখুন

ইমেইল এড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।