তিউনিসিয়ার নির্বাচন কী বার্তা দিচ্ছে?

২০১১ সালে তিউনিসিয়ায় সূচিত ‘আরব বসন্তকে’ যদি বিপ্লব বলা হয়, তাহলে ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রতিবিপ্লব বলা যায়। সেক্যুলার স্বৈরশাসক বেন আলীর পতনের পর তিউনিসিয়ার নয়া পথ নির্মাণের দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর উপর বর্তেছিলো, এবারের নির্বাচনে জনগণ তাদেরকে প্রত্যাখান করেছে। রাজনীতির বাইরে থেকে ওঠে আসা দুজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবার প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছেন। প্রথম হওয়া প্রার্থী কায়েস সাঈদ আইনের অধ্যাপক ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ। দ্বিতীয়জন নাবিল কারুয়ী একজন ব্যবসায়ী এবং মিডিয়া ম্যাগনেট।

গত কয়েকদিন তিউনিসিয়ার নির্বাচনী খবর পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে এই পয়েন্টগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে–

‌* জেসমিন বিপ্লবের মূল কারণ ছিলো ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। সেইসাথে জীবনমানের ক্রমাবনতি, দুর্নীতি ইত্যাদি। মোট কথা, অর্থনৈতিক কারণ ছিলো মুখ্য। গত ৮ বছরে অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান না হওয়ায় তরুণদের একটা বড় অংশ বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে এবার তারা ভোট দিতেই যায়নি। এ কারণে এবার ভোট পড়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশ।

‌* যারা ভোট দিয়েছে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা হারিয়েছে। ফলে তারা প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার পরিবর্তে নবীন প্রার্থীদের ভোট দিয়েছে।

‌* ২০১১ সালের পর নতুন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো যার যার আদর্শিক অবস্থানের চেয়েও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছিলো। কিন্তু দিনকে দিন স্বীয় আদর্শিক অবস্থানই মুখ্য হয়ে ওঠেছে। বলাবাহুল্য, ইসলামপন্থী বনাম সেক্যুলারপন্থীদের মাঝে তীব্র বিভাজন রয়েছে সেখানে। বিশেষত, সাবেক ফ্রেঞ্চ কলোনী হওয়ায় একদিকে কট্টর সেক্যুলারিজম, অন্যদিকে ঐতিহাসিকভাবে ইসলামের প্রভাব রয়েছে।

‌* বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে সেখানকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ইসলামপন্থী আননাহদা আগেরবার প্রেসিডেন্ট পদে নিজেরা প্রার্থী দেয়নি। তখন তারা একজন মানবাধিকারকর্মী, পেশায় ডাক্তার মুনসেফ মারজুকিকে সমর্থন দিয়েছিলো। এবারও দলের একটি অংশ নিজেরা প্রার্থী দেয়ার পরিবর্তে অন্য কাউকে সমর্থন দেয়ার পক্ষে ছিলো। কিন্তু এ বিষয়ে তারা ঐক্যমত্যে পৌঁছতে পারেনি। তবে নির্বাচনের আগেই আননাহদা বলে এসেছে, প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী দিলেও তাদের মূল ফোকাস আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচন।

‌* অন্যদিকে, সেক্যুলাররা সেখানে নানান ভাগে বিভক্ত। সদ্য প্রয়াত প্রেসিডেন্ট বেজি সাঈদ এসেবসি ছিলেন বৃহৎ সেক্যুলার দল নিদা তিউনেসের প্রধান। কিন্তু দলটির পরবর্তী সভাপতি হিসেবে নিজের ছেলেকে বেছে নেয়ায় তাঁরই দলের নেতা দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ শাহেদর সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পরিণতিতে শাহেদ দলের অধিকাংশ এমপিকে সাথে নিয়ে নতুন দল গঠন করেন। শাহেদ নিজেও এবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন। এর বাইরেও সেক্যুলারদের অন্তত অর্ধ ডজন দল রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের ভোট ব্যাংক প্রায় কাছাকাছি। সেক্যুলারদের ভোট ব্যাংক এভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ায় স্বভাবতই এর সুফল পাবে ইসলামপন্থী আননাহদা। হয়েছেও তাই। এবার আননাহদার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আব্দুল ফাত্তাহ মুরো তৃতীয় হয়েছেন। সেক্যুলার দলগুলো একক প্রার্থী দিলে হয়তোবা দ্বিতীয় পজিশনে চলে যেতে পারতো।

এবার প্রথম রাউন্ডে নির্বাচিত দুই প্রার্থীর ব্যাপারে কিছু বলি।

কায়েস সাঈদ: ‌আগেই বলেছি প্রথম হওয়া কায়েস সাঈদ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ান এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ। ২০১১ সালের আগে তাঁকে তেমন কেউ চিনতো না। তখন থেকে টিভি প্রোগ্রামে সাংবিধানিক আইন বিষয়ে মতামত দিয়ে তিনি পরিচিতি অর্জন করেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রার্থী হওয়াটা ছিলো রীতিমতো চমক।
তিনি কোনো দল গঠন করেননি। তাঁর কোনো ডেডিকেটেড কর্মী বাহিনী নেই। লোকজন, বিশেষত তরুণরা স্বেচ্ছায় তাঁর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে। তিনি নিজে কয়েকটি শহরে লোকজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁর নির্বাচনী এজেন্ডাগুলো বুঝিয়েছেন।

তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে। স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পক্ষে। গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত কাউকে অপসারণের অধিকার জনগণের রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আদর্শিকভাবে তিনি ‘রক্ষণশীল’। সমকামিতার পক্ষে প্রচারণা, নারী-পুরুষের প্রকাশ্য যৌন আচরণ ইত্যাদির বিরোধী। উত্তরাধিকার সম্পত্তিসহ বিদ্যমান শরীয়াহ আইনগুলো বহাল রাখার পক্ষে তিনি।

নাবিল কারুয়ী: ‌অন্যদিকে প্রথম রাউন্ডে দ্বিতীয় হওয়া নাবিল কারুয়ী কিছুদিন আগে একটি পার্টি গড়ে তোলেন। ধনকুবের এই প্রার্থী পপুলিস্ট অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করে লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকটা বাংলাদেশী রাজনীতিবিদদের স্টাইলে তিনি দেশটির গরীব অঞ্চলগুলোতে মানুষদেরকে ফ্রি খাবার বিলিয়েছেন। এবং সেইসব তৎপরতা ফলাও করে তাঁর টিভি চ্যানেলে প্রচার করেছেন। লোকজন এতে আকৃষ্ট হয়েছে। এর বাইরে বিশেষ কোনো ভিশন তিনি দিতে পেরেছেন বলে চোখে পড়েনি।

নির্বাচনের কিছুদিন আগে শাহেদ সরকার তাঁকে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে গ্রেফতার করে। এখনো তিনি জেলে আছেন। এই গ্রেফতার তাঁর জন্য শাপেবর হয়েছে বলে মনে হয়।

তিউনিসিয়ার সাংবিধানিক আইন অনুসারে কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশ ভোট না পেলে প্রথম ও দ্বিতীয় হওয়া প্রার্থীর মাঝে দ্বিতীয় দফা ভোট হবে। এ মাসেই সেটা হওয়ার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে কায়েস সাঈদ নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, আননাহদার প্রার্থী দ্বিতীয় রাউন্ডে আসতে না পারায় তাদের ভোটগুলো ‘রক্ষণশীল’ সাঈদ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে, পপুলিস্ট নাবিলের পক্ষে একাট্টাভাবে সেক্যুলারদের ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা কম। স্মর্তব্য, নাবিলকে গ্রেফতার করেছে ক্ষমতাসীন সেক্যুলার সরকার। তবে প্রথম দফায় ভোটপ্রদানে বিরত ভোটারদের অধিকাংশ দ্বিতীয় দফায় ভোট দিলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা বলা মুশকিল।

তিউনিসিয়ার নির্বাচন থেকে আমরা কী শিখলাম?

‌* জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানকে প্রায়োরিটি দিতে না পারলে তারা আপনাকে প্রত্যাখ্যান করবে।

‌* আদর্শের ঝাণ্ডা বেশিরভাগ মানুষের কাছে গৌণ বিষয়।

* মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জনগণ অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিপরীত দুটি আদর্শের প্রার্থীর মধ্যে তুলনামূলক রক্ষণশীল প্রার্থীকে প্রায়োরিটি দেয়।

‌* সমস্যার সমাধান করতে না পারলে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে রাজনীতির মাঠে আনকোরা কাউকে বেছে নিতে দ্বিধা করে না। প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর জন্য এটা বিশাল চ্যালেঞ্জ।

ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য লিখুন

ইমেইল এড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।