Blog

ক্যাচালের ঢামাঢোলে কিছু টুকরো চিন্তাভাবনা

১.

ছোটবেলা থেকে “ইসলামী রাষ্ট্র” বলতে বুঝে এসেছি— চোরের হাত কাটা, ব্যাভিচারীকে পাথর মারা, সুদ নিষিদ্ধ হওয়া, আর অতি অবশ্যই নামাজ কায়েম করা (অর্থাৎ নামাজের সময় সবাইকে মসজিদে যেতে বাধ্য করা)।

আমার এই ভুল ধারণাটা মূলত ভেঙেছে ২০১১ সালের দিকে মোজাম্মেল স্যারের এই লেখাটা পড়ে— ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নে ক্রমধারার অপরিহার্যত

তারপর ধীরে ধীরে তাওহীদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং আরো ক্লিয়ার হয়েছে। ইসলামকে নিছক একটি ধর্ম বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে আরো বৃহত্তর অর্থে বুঝতে শিখেছি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইসলাম হলো জীবন চলার গাইডলাইন, আর বৃহত্তর অর্থে এটি একটি সভ্যতাগত ব্যাপার— ইসলামকে এখন এভাবে বিবেচনা করি।

সমস্যা হলো, ট্র্যাডিশনাল মুসলমান ও আলেমরা ইসলামকে দেখেন একটা নিছক ধর্ম হিসেবে। আর সংস্কারপন্থী তথা রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা ইসলামকে দেখেন একটি ধর্ম + রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে।

ইসলামের মতো বৃহত্তর একটি কনসেপ্টকে এই সংকীর্ণ অর্থে সীমাবদ্ধ করে ফেলায় এর মূল আপিলটা মানুষের কাছে ফুটে ওঠছে না। ফলে উভয় দলই ইসলামকে চাপিয়ে দিতে চান।

২.

আমার একটা অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণ বলি। ইসলামের মোস্ট ফান্ডামেন্টাল বা সেন্ট্রাল কনসেপ্ট তথা ’তাওহীদ’ নিয়ে প্রচলিত আলাপে দেখা যায়— ফিকাহর বইগুলোতে তাওহীদ সংক্রান্ত আলোচনায় যেসব টার্ম ও জার্গন থাকে, সেইসবই পাবলিক লেকচারে কপচানো হয়। এর পাশাপাশি শিরক-বেদয়াত নিয়ে যেসব কথাবার্তা হয়। কিন্তু নবুওয়তের শুরুর বছরগুলোতে আল্লাহ তায়ালা যত সহজ ভাষায় মানুষকে তাওহীদ বুঝিয়েছেন, নানান যুক্তি দিয়েছেন, আমাদের ধর্মবেত্তাদেরকে সেগুলো বলতে দেখি না। তারা বরং যুক্তি-বুদ্ধিরই বিরোধী! অথচ কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তাওহীদ বুঝাতে গিয়ে নানান উপমা ও যুক্তিই দিয়েছেন মূলত। সূরা ওয়াকিয়ার (৫৬) ৫৭-৭৪ নং আয়াত এর একটি উদাহরণ। কোরআনের ২৯-৩০ পারায় এ রকম অনেক উদাহরণ আছে।

তাওহীদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং থেকে আমরা ইসলামের একটি সার্বজনীন বিশ্বপ্রকল্পের ধারণা পাই। কিন্তু এই বিশালত্বকে বুঝতে না পারার কারণে, নাকি সংকীর্ণ আত্মস্বার্থবাদী চিন্তার কারণে, লোকেরা কেন যেন পরকালের নাজাত লাভের চিন্তায় বিভোর থাকে। ফলে ‌‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ অর্থাৎ দুনিয়ার যা হয় হোক, লোকজনকে ঠ্যাঙ্গিয়ে হলেও আমার বেহেশত নিশ্চিত করতে হবে— এমন একটা মানসিকতায় আচ্ছন্ন থাকে ধর্মবাদী এবং রাজনৈতিক ইসলামপন্থী মুসলমানরা।

তাওহীদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং বুঝতে পারলে দুনিয়া সম্পর্কে একটা ইতিবাচক মনমানসিকতা থাকার কথা। ইসলামের বৃহত্তর আপিলকে ধরতে পারার কথা। কিন্তু, সেই ধৈর্য কই! যেভাবেই হোক, বেহেশত কনফার্ম করতে হবে— এই হলো ধারণা।

৩.

এক গার্মেন্টস কারখানায় সম্প্রতি নামাজ না পড়লে বেতন কাটার নোটিশ জারির পর মিডিয়াতে নিউজ হওয়ায় লোকেরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এটি আমার কাছে প্রত্যাশিত ছিলো। এই প্রতিক্রিয়া পরাজিত মানসিকতার মোক্ষম উদাহরণ। মানে পরাজিত হয়ে আছে, কিন্তু মানতে নারাজ যে সে পরাজিত— ছোটবেলায় খেলার মাঠের এ ধরনের স্মৃতি অনেকেরই আছে বোধকরি। ইসলামের সভ্যতাগত পতনের পর থেকে এটাই মুসলমানদের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

৪.

গার্মেন্টসের ঘটনায় একজন তার পোস্টে সাজেস্ট করেছেন— বেতন না কেটে বরং নামাজ পড়ার জন্য ইনটেনসিভ দেয়া যেতো। সেখানে আমি নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছি:

আমার কাছে এমনকি ইনসেনটিভ দেয়াটাকেও সঠিক বলে মনে হয় না। বাচ্চাদেরকে অভ্যস্ত করানোর জন্য দেয়া যায় বটে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদেরকে নয়। প্রাপ্তবয়স্কদেরকে আল্লাহ তায়ালা আকল দিয়েছেন। এবং ইসলামের দাবি হলো এই আকলকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা। একজন মুসলমান যে সত্যিই সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আমরা সেটার প্রত্যয়ন করে থাকি। তাই নামাজ আদায়ের জন্য ইনটেনসিভ দেয়ার মানে দাঁড়ায়— আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘুষ দিয়ে তাঁর প্রতি বান্দার সাবমিশন আদায় করা। যা প্রকারান্তরে আল্লাহর প্রতি অবমাননা। আল্লাহ কোনো বান্দার সাবমিশনের মুখাপেক্ষি নন— সূরা ইখলাসে বর্ণিত তাওহীদের এই মূল বিষয়টা বিবেচনায় রাখলে আমরা এটি সহজে বুঝতে পারি।

৫.

এবার মজার একটা ব্যাপার বলি। আমি ব্যক্তিগতভাবে সুফিবাদকে প্রেফার করি না। কিন্তু এই ঘটনায় দেখলাম, সুফিবাদের প্রমোটর লোকজনও আইন করে লোকজনকে নামাজ পড়ানোর পক্ষে। এই তামাশা দেখার জন্য আসলেই প্রস্তুত ছিলাম না। 😀

ফেসবুক লিংক

প্রসঙ্গ: ফেক আইডি থেকে ইসলামিক অ্যাক্টিভিজম করা

ইসলাম সম্পর্কে আমি যা বুঝেছি, তার একটা দিক হলো, রেসপন্সিবল হওয়া। অর্থাৎ কৃত কাজকর্মের দায় নিতে হবে।

ফেক আইডি থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামিক পার্সপেক্টিভ থেকে মতামত দেওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি পাবলিকলি এসব মতামতের দায়িত্ব নেয়া থেকে বেঁচে যায়। ফেক আইডির পরিচয় কেউ জানে না। ফলে যেকোনো লেংথে ফেক আইডি থেকে কথা বলা যায়। পরিচয় সম্পর্কে কেউ না জানলেও নিছক ধারণা থেকে ফেক আইডিকে অনেক বড় আল্লামা বলে মনে হতে পারে। যদিও বাস্তবে তা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

দায়দায়িত্ব নেওয়ার ঝুঁকি থেকে বেঁচে থাকায় ফেক আইডি থেকে এমন সব কথাবার্তাও বলা যায়, যাতে করে সমাজে বিশৃঙ্খলা তথা ফেতনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো অসুবিধা দেখলে ফেক আইডির মালিক আইডি ডিলিট করেই পার পেয়ে যায়। কিন্তু তার কথার দ্বারা যারা মোটিভেটেট হয়, তাদের জীবন তো আর এত সহজে পাল্টে যায় না।

এ কারণে দেখবেন বিভিন্ন উগ্রপন্থী লোক ফেক আইডি থেকে অ্যাক্টিভিজম করে। মূল কারণটা হচ্ছে দায়দায়িত্ব এড়ানো। অথচ প্রকৃত মুসলমানের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত, দায় দায়িত্ব নিয়ে কথা বলা।

এই ফান্ডামেন্টাল ব্যাপারটা যে মেনটেইন করতে পারে না, সে যত বড় হক কথাই বলুক না কেন, তার রেফারেন্সে সেটা আমল করা অনুচিত বলে আমার কাছে মনে হয়।

উল্লেখ্য, ইসলামে কার্যগত দিক থেকে জিহাদ এবং ফিতনার মধ্যে পার্থক্য খুব অল্প।

(একজনের পোস্টে একটু আগে এই কমেন্টটি করেছি। ভাবলাম টাইমলাইনেও তুলে রাখি।)

ফেসবুক লিংক

পর্দা প্রসঙ্গে কোরআনের দলীলসমূহের পর্যালোচনা

পর্দা সংক্রান্ত আয়াত রয়েছে কোরআনের সূরা আহযাব এবং সূরা নূরে। চলুন,আয়াতগুলোর অর্থ শুরুতে পড়ে নেই।

প্রথমে সূরা আহযাবের ৩০-৩৩ নং আয়াত দুটি দেখা যাক:

৩০) হে নবী-পত্নীরা! যে কাজ স্পষ্টত অশ্লীল, তোমাদের মধ্যে কেউ তা করলে, তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে এবং এটা আল্লাহর জন্য সহজ।

৩১) তোমাদের যে কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি অনুগত হবে ও সৎকাজ করবে তাকে আমি পুরস্কার দিব দু’বার এবং তার জন্য রেখেছি সম্মানজনক রিযিক।

৩২) হে নবীর পত্নীরা! তোমরা অন্য নারীদের মতো নও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তাহলে পরপুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। এবং তোমরা পরিষ্কার ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে।

৩৩) এবং তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে; প্রাচীন জাহেলী যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থাকবে; হে নবীর পরিবার! আল্লাহ শুধু চান তোমাদের হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র করতে।

এবার একই সূরার ৫৯-৬২ নং আয়াতসমূহ দেখুন:

৫৯) হে নবী! তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মু’মিন নারীদেরকে বলে দাও তারা যেন তাদের চাদরের প্রান্ত তাদের ওপর টেনে নেয়৷ এটি অধিকতর উপযোগী পদ্ধতি, যাতে তাদেরকে চিনে নেয়া যায় এবং কষ্ট না দেয়া হয়৷ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷

৬০) যদি মুনাফিকরা এবং যাদের মনে গলদ আছে তারা, আর যারা মদীনায় উত্তেজনাকর গুজব ছড়ায় তারা নিজেদের তৎপরতা থেকে বিরত না হয়, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবার জন্য তোমাকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দেবো; তারপর খুব কমই তারা এ নগরীতে তোমার সাথে থাকতে পারবে৷

৬১) তাদের ওপর লানত বর্ষিত হবে চারদিক থেকে, যেখানেই পাওয়া যাবে তাদেরকে পাকড়াও করা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।

৬২) এটিই আল্লাহর সুন্নাত, এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে পূর্ব থেকে এটিই চলে আসছে এবং তুমি আল্লাহর সুন্নাতে কোনো পরিবর্তন পাবে না৷

পর্দার আয়াত নাযিলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:

পর্দা সংক্রান্ত সূরা আহযাবের এই আয়াতগুলো প্রথম নাজিল হয় পঞ্চম বা ষষ্ঠ হিজরীতে। খন্দক বা আহযাবের যুদ্ধে জয়লাভের পর ইসলামের বিরোধীপক্ষ বুঝে গিয়েছিল সামরিকভাবে মুহাম্মদকে (সা) পরাজিত করা তাদের পক্ষে রীতিমত অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে তারা মুসলমানদের নেতার চরিত্রহননের মাধ্যমে তাদেরকে নৈতিকভাবে পরাজিত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে তারা রাসূলের (সা) পালক পুত্র জায়েদের (রা) সাবেক স্ত্রী যয়নাব বিনতে জাহাশের (রা) সাথে মহানবীর (সা) বিয়েকে কেন্দ্র করে রটনা তৈরি করে। তখনকার কোনো কোনো সাধারণ মুসলমান এসব রটনার কিছু কিছু বিশ্বাসও করে ফেলেছিলো। তখন আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে ওহী নাযিল করে মহানবীকে (সা) সুস্পষ্ট সমর্থন প্রদান করেন।

এ ঘটনায় সুবিধা করতে না পেরে মদীনায় বসবাসরত ইহুদী, মুশরিক ও মুনাফিকরা নতুন করে মহানবীর (সা) পরিবারের উপর কালিমা লেপন করার পরিকল্পনা করতে থাকে। এ প্রসঙ্গে জেনে রাখা দরকার, মহানবীর (সা) স্ত্রীদের জন্য তৈরি করা ছোট ছোট খুপরি ঘরগুলো মসজিদে নববীর সাথে লাগোয়া ছিল। দিনরাত মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষের অবাধ যাতায়াত ছিল সেখানে। ফলে এই উন্মুক্ত পরিবেশের সুযোগ নিয়ে মহানবীর (সা) স্ত্রীদের ব্যাপারে আরেকটা রটনা তৈরি করার প্রবল আশঙ্কা ছিল।

পরিস্থিতি আন্দাজ করে তখন ওমর (রা) মহানবীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে তাঁর স্ত্রীগণ যেন পর্দাব্যবস্থার আওতায় চলে যান। তবে মহানবী (সা) তখনো ওমরের (রা) পরামর্শ বাস্তবায়ন করেননি।

এই প্রেক্ষিতে সূরা আহযাবের ৩২ ও ৩৩ নং আয়াত দুটি তার পরিবারবর্গের জন্য বিশেষভাবে নাজিল হয়। এ আয়াত দুটি তার পরিবারবর্গের জন্য খাস। আয়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনা থেকেই এটি বোঝা যায়। তবে ৫৯ নং আয়াতটি সব মুমিন নারীর জন্যই প্রযোজ্য। আয়াতটিতেই তা বলা আছে। পরবর্তী ৬০-৬২ নং আয়াতগুলোতে দুষ্টচিন্তার লোকজন ও রটনাকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহ সুস্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়েছেন।

পর্দা সংক্রান্ত কোনো আলোচনা, নিবন্ধ বা বইপত্রে এই প্রেক্ষাপট নিয়ে কাউকে কথা বলতে দেখি না। বিশেষ করে, ৬০-৬২ নং আয়াতগুলো পর্দা সংক্রান্ত রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখি না। পর্দার আয়াত নাযিলের এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সবাই কেন এড়িয়ে যান, তা আমার বুঝে আসে না।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পর্দার সাধারণ বিধান:

এবার আসুন সূরা নূরের পর্দা সংক্রান্ত আয়াতগুলো পর্যালোচনা করি।

৩০) হে নবী! মু’মিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হেফাজত করে ৷ এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র পদ্ধতি ৷ যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন ৷

৩১) আর হে নবী! মু’মিন মহিলাদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানগুলোর হেফাজত করে আর তাদের সাজসজ্জা না দেখায়, যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তা ছাড়া ৷ আর তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল দিয়ে তাদের বুক ঢেকে রাখে৷ তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে নিম্নোক্তদের সামনে ছাড়া— স্বামী, বাপ, স্বামীর বাপ, নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজের মেলামেশার মেয়েদের, নিজের মালিকানাধীনদের, অধীনস্থ পুরুষদের যাদের অন্য কোনো রকম উদ্দেশ্য নেই এবং এমন শিশুদের সামনে ছাড়া যারা মেয়েদের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ ৷ তারা যেন নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেবার উদ্দেশ্য সজোরে পদক্ষেপ না করে৷ হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে৷

এখানে সকল মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য পর্দা সংক্রান্ত সাধারণ বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। এটি সূরা আহযাবের ধারাবাহিকতা। খেয়াল করলে দেখবেন, প্রথমেই পুরুষদেরকেও পর্দা পালন সংক্রান্ত কিছু নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আরেকটা বিষয় হলো, সাধারণ মুসলিম নারীদের মুখ ঢাকার কথা কোথাও বলা নেই। বিশেষত নারীদের জন্য পর্দার ক্ষেত্রে ৫টি বিষয় আয়াতগুলো থেকে পাওয়া যায়।

১) দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে।

২) লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে হবে।

৩) আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়া সাজসজ্জা ছাড়া বাড়তি সাজসজ্জা প্রদর্শন করা যাবে না।

৪) তবে সাজসজ্জা প্রদর্শন করতে পারবে গায়রে মাহরামদের সামনে।

৫) উড়না দিয়ে যেন বক্ষদেশ ঢেকে রাখে/ চাদরের প্রান্ত যেন নিজেদের উপর টেনে নেয়।

এই পাঁচটি পয়েন্টের মধ্যে ৩ এবং ৫ নং পয়েন্ট নিয়েই যত বিতর্ক। এগুলোর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলতে চান, এগুলো দ্বারা মুখ ঢাকাও উদ্দেশ্য। অথচ, হাদীসের অসংখ্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, মহিলা সাহাবীগণ মসজিদে গিয়েছেন, ক্ষেত-খামারে কাজ করতেন, এমনকি বাজারের দায়িত্ব পালনের কথাও আমরা জানি।
মোট কথা, কোরআনের আয়াত থেকে স্পষ্ট,সাধারণ মুমিন নারীদের জন্য মুখ ঢাকার বাধ্যবাধকতা নেই।

নবীপত্নীদের জন্য প্রযোজ্য বিধান কি অন্যদের জন্যও প্রযোজ্য?

কেউ কেউ বলেন, নবীপত্নীদের জন্য পর্দার যে বিধান, তা সাধারণ মুসলমানদের জন্যও প্রযোজ্য। এ কথার দুটি সমস্যা আছে।

প্রথমত, যদি তাই হতো, তাহলে বিধানটি আমভাবে সবার জন্য নাযিল করা হতো। নবী পরিবারের জন্য খাস এবং সাধারণ মুমিনদের জন্য আমভাবে ভিন্ন রকম বিধান নাযিল হতো না।

দ্বিতীয়ত, পর্দার বিধান ছাড়াও নবী ও নবী পরিবারের জন্য খাসভাবে কিছু বিধান আছে যেগুলো অন্যদের জন্য প্রযোজ্য নয়। যেমন: (১) রাসূলের (সা) জন্য চারটির৷ অধিক বিয়ে জায়েজ করা হলেও অন্য কারো জন্য তা জায়েজ নেই। (২) রাসূল (সা) ও তাঁর পরিবারবর্গের জন্য সদকা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হলেও অন্যদের জন্য তা জায়েজ। (৩) রাসূলের (সা) সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদের মাঝে বন্টন নিষিদ্ধ হলেও অন্য মুসলমানদের জন্য এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত বিধান রয়েছে।

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, রাসূলের (সা) পবিত্র স্ত্রীগণের জন্য বিশেষ পরিস্থিতিতে খাসভাবে পর্দার যে বিধান নাযিল হয়েছিলো, তা সাধারণ মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য নয়। সাধারণ মুসলমানদের জন্য বরং পর্দার সাধারণ বিধান, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন, তা-ই প্রযোজ্য।

শেষকথা:

পর্দা ইস্যুতে ব্যাপকভাবে ভুল বুঝাবুঝির একটা অন্যতম কারণ হলো প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে বিচ্ছিন্ন রেফারেন্সের ভিত্তিতে ইসলামকে বুঝতে যাওয়া। পর্দার বিধান যখন ধাপে ধাপে নাজিল হচ্ছিলো, তখনকার মদীনার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। তাহলে আমরা বুঝতে পারবো কেন রাসূলের (সা) স্ত্রীগণ এবং অপরাপর মুসলমানদের জন্য দুই ধরনের বিধান দেয়া হয়েছে। কিন্তু কনটেক্সটকে বাদ দিয়ে শুধু রেফারেন্স এবং পরবর্তী যুগে প্রদত্ত এসব রেফারেন্সের লোকপ্রিয় ব্যাখ্যাগুলোকে কোরআন-সুন্নাহর দলীলের সমমান হিসেবে বিবেচনা করলে আমরা ভুল উপসংহারে পৌঁছবো।

ফেসবুক লিংক

চিন্তাশালা!

শব্দটা আজ প্রথম আলো থেকে শিখেছি। তাদের এক কলামিস্টের পরিচয় লিখতে গিয়ে বলেছে, তিনি অমুক চিন্তাশালার তমুক। হাতিশালা, ঘোড়াশালার কথা পড়েছি। চিন্তাশালার কথা শুনি নাই।

প্রথমে ভেবেছি, এটা কি শালা-দুলাভাই টাইপের কিছু? কিন্তু বড় শালা, মেঝো শালা, ছোট শালা কিংবা গালি হিসেবে শালার পুত, শালার ঘরের শালা ইত্যাদি শুনলেও চিন্তাশালার কথা তো শুনি নাই। আর এ রকম কিছু হলেই বা সেটা একজন কলামিস্টের পরিচয় হবে কেন!

থিঙ্কট্যাঙ্ক শব্দটার বাংলা যে চিন্তাশালা হতে পারে,এটা বুঝতে কিছুটা সময় লেগেছে।

ফেসবুক লিংক

তিউনিসিয়ার নির্বাচন কী বার্তা দিচ্ছে?

২০১১ সালে তিউনিসিয়ায় সূচিত ‘আরব বসন্তকে’ যদি বিপ্লব বলা হয়, তাহলে ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রতিবিপ্লব বলা যায়। সেক্যুলার স্বৈরশাসক বেন আলীর পতনের পর তিউনিসিয়ার নয়া পথ নির্মাণের দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর উপর বর্তেছিলো, এবারের নির্বাচনে জনগণ তাদেরকে প্রত্যাখান করেছে। রাজনীতির বাইরে থেকে ওঠে আসা দুজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবার প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছেন। প্রথম হওয়া প্রার্থী কায়েস সাঈদ আইনের অধ্যাপক ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ। দ্বিতীয়জন নাবিল কারুয়ী একজন ব্যবসায়ী এবং মিডিয়া ম্যাগনেট।

গত কয়েকদিন তিউনিসিয়ার নির্বাচনী খবর পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে এই পয়েন্টগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে–

‌* জেসমিন বিপ্লবের মূল কারণ ছিলো ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। সেইসাথে জীবনমানের ক্রমাবনতি, দুর্নীতি ইত্যাদি। মোট কথা, অর্থনৈতিক কারণ ছিলো মুখ্য। গত ৮ বছরে অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান না হওয়ায় তরুণদের একটা বড় অংশ বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে এবার তারা ভোট দিতেই যায়নি। এ কারণে এবার ভোট পড়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশ।

‌* যারা ভোট দিয়েছে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা হারিয়েছে। ফলে তারা প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার পরিবর্তে নবীন প্রার্থীদের ভোট দিয়েছে।

‌* ২০১১ সালের পর নতুন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো যার যার আদর্শিক অবস্থানের চেয়েও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছিলো। কিন্তু দিনকে দিন স্বীয় আদর্শিক অবস্থানই মুখ্য হয়ে ওঠেছে। বলাবাহুল্য, ইসলামপন্থী বনাম সেক্যুলারপন্থীদের মাঝে তীব্র বিভাজন রয়েছে সেখানে। বিশেষত, সাবেক ফ্রেঞ্চ কলোনী হওয়ায় একদিকে কট্টর সেক্যুলারিজম, অন্যদিকে ঐতিহাসিকভাবে ইসলামের প্রভাব রয়েছে।

‌* বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে সেখানকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ইসলামপন্থী আননাহদা আগেরবার প্রেসিডেন্ট পদে নিজেরা প্রার্থী দেয়নি। তখন তারা একজন মানবাধিকারকর্মী, পেশায় ডাক্তার মুনসেফ মারজুকিকে সমর্থন দিয়েছিলো। এবারও দলের একটি অংশ নিজেরা প্রার্থী দেয়ার পরিবর্তে অন্য কাউকে সমর্থন দেয়ার পক্ষে ছিলো। কিন্তু এ বিষয়ে তারা ঐক্যমত্যে পৌঁছতে পারেনি। তবে নির্বাচনের আগেই আননাহদা বলে এসেছে, প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী দিলেও তাদের মূল ফোকাস আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচন।

‌* অন্যদিকে, সেক্যুলাররা সেখানে নানান ভাগে বিভক্ত। সদ্য প্রয়াত প্রেসিডেন্ট বেজি সাঈদ এসেবসি ছিলেন বৃহৎ সেক্যুলার দল নিদা তিউনেসের প্রধান। কিন্তু দলটির পরবর্তী সভাপতি হিসেবে নিজের ছেলেকে বেছে নেয়ায় তাঁরই দলের নেতা দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ শাহেদর সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পরিণতিতে শাহেদ দলের অধিকাংশ এমপিকে সাথে নিয়ে নতুন দল গঠন করেন। শাহেদ নিজেও এবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন। এর বাইরেও সেক্যুলারদের অন্তত অর্ধ ডজন দল রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের ভোট ব্যাংক প্রায় কাছাকাছি। সেক্যুলারদের ভোট ব্যাংক এভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ায় স্বভাবতই এর সুফল পাবে ইসলামপন্থী আননাহদা। হয়েছেও তাই। এবার আননাহদার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আব্দুল ফাত্তাহ মুরো তৃতীয় হয়েছেন। সেক্যুলার দলগুলো একক প্রার্থী দিলে হয়তোবা দ্বিতীয় পজিশনে চলে যেতে পারতো।

এবার প্রথম রাউন্ডে নির্বাচিত দুই প্রার্থীর ব্যাপারে কিছু বলি।

কায়েস সাঈদ: ‌আগেই বলেছি প্রথম হওয়া কায়েস সাঈদ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ান এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ। ২০১১ সালের আগে তাঁকে তেমন কেউ চিনতো না। তখন থেকে টিভি প্রোগ্রামে সাংবিধানিক আইন বিষয়ে মতামত দিয়ে তিনি পরিচিতি অর্জন করেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রার্থী হওয়াটা ছিলো রীতিমতো চমক।
তিনি কোনো দল গঠন করেননি। তাঁর কোনো ডেডিকেটেড কর্মী বাহিনী নেই। লোকজন, বিশেষত তরুণরা স্বেচ্ছায় তাঁর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে। তিনি নিজে কয়েকটি শহরে লোকজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁর নির্বাচনী এজেন্ডাগুলো বুঝিয়েছেন।

তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে। স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পক্ষে। গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত কাউকে অপসারণের অধিকার জনগণের রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আদর্শিকভাবে তিনি ‘রক্ষণশীল’। সমকামিতার পক্ষে প্রচারণা, নারী-পুরুষের প্রকাশ্য যৌন আচরণ ইত্যাদির বিরোধী। উত্তরাধিকার সম্পত্তিসহ বিদ্যমান শরীয়াহ আইনগুলো বহাল রাখার পক্ষে তিনি।

নাবিল কারুয়ী: ‌অন্যদিকে প্রথম রাউন্ডে দ্বিতীয় হওয়া নাবিল কারুয়ী কিছুদিন আগে একটি পার্টি গড়ে তোলেন। ধনকুবের এই প্রার্থী পপুলিস্ট অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করে লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকটা বাংলাদেশী রাজনীতিবিদদের স্টাইলে তিনি দেশটির গরীব অঞ্চলগুলোতে মানুষদেরকে ফ্রি খাবার বিলিয়েছেন। এবং সেইসব তৎপরতা ফলাও করে তাঁর টিভি চ্যানেলে প্রচার করেছেন। লোকজন এতে আকৃষ্ট হয়েছে। এর বাইরে বিশেষ কোনো ভিশন তিনি দিতে পেরেছেন বলে চোখে পড়েনি।

নির্বাচনের কিছুদিন আগে শাহেদ সরকার তাঁকে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে গ্রেফতার করে। এখনো তিনি জেলে আছেন। এই গ্রেফতার তাঁর জন্য শাপেবর হয়েছে বলে মনে হয়।

তিউনিসিয়ার সাংবিধানিক আইন অনুসারে কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশ ভোট না পেলে প্রথম ও দ্বিতীয় হওয়া প্রার্থীর মাঝে দ্বিতীয় দফা ভোট হবে। এ মাসেই সেটা হওয়ার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে কায়েস সাঈদ নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, আননাহদার প্রার্থী দ্বিতীয় রাউন্ডে আসতে না পারায় তাদের ভোটগুলো ‘রক্ষণশীল’ সাঈদ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে, পপুলিস্ট নাবিলের পক্ষে একাট্টাভাবে সেক্যুলারদের ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা কম। স্মর্তব্য, নাবিলকে গ্রেফতার করেছে ক্ষমতাসীন সেক্যুলার সরকার। তবে প্রথম দফায় ভোটপ্রদানে বিরত ভোটারদের অধিকাংশ দ্বিতীয় দফায় ভোট দিলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা বলা মুশকিল।

তিউনিসিয়ার নির্বাচন থেকে আমরা কী শিখলাম?

‌* জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানকে প্রায়োরিটি দিতে না পারলে তারা আপনাকে প্রত্যাখ্যান করবে।

‌* আদর্শের ঝাণ্ডা বেশিরভাগ মানুষের কাছে গৌণ বিষয়।

* মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জনগণ অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিপরীত দুটি আদর্শের প্রার্থীর মধ্যে তুলনামূলক রক্ষণশীল প্রার্থীকে প্রায়োরিটি দেয়।

‌* সমস্যার সমাধান করতে না পারলে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে রাজনীতির মাঠে আনকোরা কাউকে বেছে নিতে দ্বিধা করে না। প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর জন্য এটা বিশাল চ্যালেঞ্জ।

ফেসবুক লিংক

পলিটিক্যাল কম্পাস

জিয়া হাসান ভাই গতকাল পলিটিক্যাল কম্পাস নামে একটা ইন্টারেস্টিং টেস্টিং সাইটের সন্ধান দিয়েছেন। টেস্টে উনি নিজেকে লিবার্টারিয়ান লেফট হিসেবে নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন।

তখন একবার নিজের জন্য টেস্ট দেবো বলে ভেবেছিলাম। আজকে টেস্টটা করলাম। আমার পজিশনও একই ক্যাটাগরিতে আসলো (ছবি দ্রষ্টব্য)।

তবে আমি টেস্ট করেছি মূলত পিনাকী ভট্টাচার্যের পোস্ট দেখে। তাঁর অনুমান, এই টেস্টে বাংলাদেশের ৭০% ইসলামপন্থীকে নাকি লিবার্টারিয়ান লেফট হিসেবে দেখা যাবে। বিপরীতে বামপন্থীদেরকে অথরিটেরিয়ান লেফট হিসেবে দেখা যাবে।

উনার অনুমান দেখে বেশ অবাক হয়েছি। বামপন্থীদের ব্যাপারে অনুমানটা অনেকাংশে সঠিক বলে মনে হলেও ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে তাঁর অনুমান সঠিক মনে হলো না। আমার কাছে প্রচলিত ইসলামপন্থীদেরকে বামপন্থী মুদ্রার অপর পিঠ বলেই মনে হয়। এই দুই গোষ্ঠীর আদর্শটাই জাস্ট ভিন্ন, বাট বাকি অনেক কিছুতেই কপি-পেস্ট মিল আছে।

মজার ব্যাপার হলো, পিনাকী ভট্টাচার্যের পোস্টেই নিজেকে ইসলামপন্থী দাবিকারী কয়েকজন টেস্টে অথরিটেরিয়ান লেফট হিসেবে নিজেদের অবস্থান এসেছে বলে জানিয়েছে। এবং নিজেদের এই দুর্গতি দেখে তারা অবাক। একজনকে দেখলাম স্বয়ং স্কেলটাকেই গালমন্দ করছে 😁

কেউ টেস্ট করতে চাইলে এখানে যান: https://www.politicalcompass.org/test

ফেসবুক লিংক

ধর্মবাদী ট্রু সেক্যুলার মুসলমান

(খ্রিষ্ট) ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের মাধ্যমে আধুনিক যুগে ফ্রান্সে সেক্যুলারিজমের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। ইন্টারেস্টিংলি বাঙালি মুসলমানরা এই জিনিসটা ভালোই আত্মিকরণ করেছে। বাঙালী মুসলমানদের জীবনযাপনের সাথে ইসলামের সম্পর্ক সাধারণত নেই। ইসলাম বলতে আমাদের বুঝ হলো কিছু রিচুয়াল (যা ধর্মকর্ম বলে পরিচিত) পালন করা। এর বাইরে ব্যক্তিগত জীবনবোধ বা ওয়ার্ল্ডভিউর ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমান ইসলামকে সাধারণত বিবেচনা করে না। এর প্রমাণ আপনি পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র পাবেন।

এ জন্যই দেখবেন সেজদা দিতে দিতে কপালে দাগ ফেলে দেয়া লোকটাও নিঃসঙ্কচিত্তে ঘুষ খায়। নফল ইবাদতসহ সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া মানুষটিও অন্যের অধিকার নষ্ট করতে কুণ্ঠিত হয় না। পরিবার পরিচালনা, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের হক, আয়-উপার্জনসহ হাজারো বিষয়ে তারা নিজের একান্ত বুঝ মতোই চলে। এসব বিষয়ে ইসলামের যে নির্দিষ্ট কিছু মূলনীতি রয়েছে, সেগুলো তাদের বিবেচনাতেই নাই। তাদের কাছে ইসলাম হলো নিজের তরিকায় দুনিয়ার জীবনটা পার করে পরকালটাও হাতিয়ে নেয়ার এক মোক্ষম হাতিয়ার। অদ্ভূত লাগে!

আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অধিকাংশ মানুষই ধর্মীয় ইবাদতের বাইরে জীবনযাপনের নানা বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা সম্পর্কে জানতেও আগ্রহী নয়। এর কারণ বোধহয়, যৌক্তিক মানুষ হিসেবে জানতে গেলে তো মানার প্রশ্ন চলে আসে। পরিস্থিতির কারণেে এ ধরনের কথাবার্তার পরিবেশে উপস্থিত থাকলে সাধারণত দু ধরনের ঘটনা ঘটে। (১) সহজেই সবকিছুতে সম্মতি দিয়ে বসে। এর সুবিধা হলো, এতে করে এসব ‘বিব্রতকর’ আলোচনা থেকে সহজে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। (২) কিছুক্ষণ চুপচাপ শুনে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়।

এহেন মনমানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে এত এত মুসলমান দিয়ে কী লাভ? যতটুকু বুঝি, ইসলাম তো কোয়ালিটিটিভ ব্যাপার, মুসলমানের সংখ্যাধিক্য ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তথাকথিত ‘বিগ পিকচার’ নিয়ে যেসব ইসলামপন্থী দিনরাত একাকার করে ফেলেন, তাদেরকে মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের এসব বৈপরীত্ব নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা করতে দেখি না। তারা ঘরে বসে হাতিঘোড়া মারতে ব্যস্ত। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা কয়টা বোমা মারলো, অমুক একাডেমিক কী লিখলো, তমুক মিডিয়াতে ইসলামোফোবিয়া কদ্দুর প্রকাশ পেলো- এইসব ইস্যুগুলো গুরুত্বপূর্ণ বটে। তবে যেই ‘উম্মাহ’ নিয়া এত চিন্তাভাবনা করেন, সেই ‘উম্মাহ’ যাদের নিয়ে গঠিত, তারা মুসলমান হিসেবে কতটুকু কোয়ালিফাই করে, না করলে তাদেরকে সত্যিকারের মুসলমান হিসেবে গড়ে তুলতে করণীয় কী- এইসব কথাবার্তায় দেখেছি কেউ মজা পায় না। এগুলোতে কোনো সেনশেসন নাই। তাদের কাছে এইগুলো নীরস, পানসে ব্যাপার। এটাও এক ধরনের সেক্যুলার ইসলামচর্চা বটে।

ফেসবুক লিংক

সাদামাটা একটি গোলাপ

গোলাপ

বসরাই গোলাপ নয়,

নয় ইরানী কিংবা জুলিয়াস রোজ,

নিতান্তই সাদামাটা একটি গোলাপ।

 

ভেতরে যুদ্ধ, হিংসা, কদর্যতা

বাইরে প্রস্ফুটিত গোলাপ।

কত ঘৃণার উত্তাপ ছাপিয়ে

গোলাপের জয় হলো!

স্বার্থক গোলাপী জীবন!

 

ফেসবুক লিংক

ম্যাস-ম্যান

চারপাশে খালি রোবট দেখি

কিয়ের্কেগার্দ যাদেরকে ‘ম্যাস-ম্যান’ বলে গিয়েছিলেন।

এদের আছে দুইটা করে চোখ, হাত আর পা

একটা ভুড়ি আছে নাদুসনুদুস

মগজও একটা আছে বটে, তবে সেটা কেবল অন্যদের অনুকরণের বেলায়ই কাজে লাগে।

আত্মস্বার্থবাদী এই দুপেয়ে জীবগুলোর মাঝেই

আমার বসবাস।

সমাজের ডান্ডাবেড়ি পরানো এই জীবগুলো

পেটপুরে খেয়ে, হেগে-মুতে আরামে ঘুমাতে যায়,

মরণঘুমও চলে আসে অকস্মাৎ।

এটাই নাকি জীবন! স্বার্থক জীবন!

বটে!

 

ফেসবুক লিংক

আমাদের মার্কস ভক্তগণ

কার্ল মার্কসের ২০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কসপন্থী কয়েকজন শিক্ষকের উদ্যোগে একটি আলোচনা সভা হয়েছে গতকাল। উদ্দেশ্য ছিলো শিক্ষার্থীদের সাথে মার্কসকে পরিচয় করিয়ে দেয়া। জানার কৌতুহল থেকে আমিও গেলাম। আমিই একমাত্র অমার্কসবাদী শ্রোতা ছিলাম কি না, তা অবশ্য নিশ্চিত নই।

গিয়ে মনে হলো, চট্টগ্রামের আল্লামা তাহেরশাহ ভক্ত সুন্নীদের মজলিশে বোধহয় ঢুকে পড়েছি ভুল করে। ভক্তির ঠেলায় টেকা যাচ্ছে না। হার্ডকোর ‘বস্তুবাদী’দের মার্কসবন্দনার চোটপাটে আমি দিশেহারা।

প্রায় প্রত্যেকেই স্বীকার করে নিয়েছেন, মার্কস সম্বন্ধে তাদের পড়াশোনা নাই। নিতান্তই একাডেমিক প্রয়োজনে ২/৪ পাতা পড়েছেন। এর বেশি কিছু নয়। তবে এটুকু বলার পরই শুরু হয় মার্কস বন্দনা। পুরাই ‘সোনার মদিনা আমার প্রাণের মদিনা, সব ভুলিব, কিন্তু তোমায় ভুলতে পারি না’ অবস্থা।

লন্ডন ফেরত এক মার্কসবাদী বক্তব্য দিলেন। বক্তব্যের আগে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো, তিনি মার্কসের মাজার লন্ডনিস্থানে ১০ বছর থেকে এসেছেন। বক্তা নিজেও দাবি করলেন, লন্ডনের সাথে তার ‘আবেগগত’ সম্পর্ক আছে। মার্কসের মাজারের পাশে বেঞ্চিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে থেকে তিনি মার্কসকে অনুভব করার চেষ্টা করতেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। পুরাই আধ্যাত্মিক ব্যাপার-স্যাপার।

আরেকজন এসে শুরু করলেন সাবঅল্টার্ন দিয়ে। মাঝখানে এক চিমটি রবীন্দ্রনাথ ও লালন। তারপর মুঘল আমলের ‘আশরাফ-আতরাফের’ ঘুটা। ব্যস! হয়ে গেলো “ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছেন” প্রশ্নটা। কমপ্লিট প্যাকেজ অব মার্কসবাদ!

কিন্তু সবকিছু যদি ‘উৎপাদন সম্পর্কের’ ব্যাপার হয়, সবই যদি বস্তুগত ব্যাপার হয়, তাহলে এইসব মার্কসবাদীদের এত গদগদ আবেগ কোত্থেকে আসে? ‘ব্যক্তিমালিকানার ধারণা’ যদি নিছক পুঁজিবাদ আরোপিত ব্যাপারই হয়, তাইলে আমার দেড় বছরের পিচ্চি ভাতিজার মধ্যেও সেই ধারণার অনুপ্রবেশ ক্যামনে ঘটলো? পুঁজিবাদ কি ইদানীং মায়ের পেট থেকেই ব্রেইনওয়াশ শুরু করসে নাকি? মার্কস বলেছেন, মানবসভ্যতার ইতিহাস হলো দ্বান্দ্বিকতার ইতিহাস। হেগেলের সূত্র ধরে তিনি যে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রস্তাব করেছেন, সেটা কি তাঁর প্রস্তাবিত কমিউনিজমেও কাজ করবে? না করার তো কথা না। আর করলে তো তাঁর সূত্র অনুসারেই কমিউনিজম টিকবে না। ভেঙ্গে নতুন কিছু হবে।

এইসব সাধারণ প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কসবাদী একাডেমিকসদের সেই প্রোগ্রামে ছিলো না। ভেবেছিলাম প্রশ্নোত্তর পর্বে জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতেই তারা বলে দিয়েছেন, চাইলে কেউ প্রশ্ন করতে পারে। তবে উত্তর দেয়ার কেউ নাই।

কারণ, তারা তো আগেই বলে দিয়েছেন, তারা মার্কস পড়েননি। তারা তো নিছক ভক্ত মাত্র!

ফেসবুক লিংক